জুলাই বিপ্লব ২০২৪: বাংলাদেশ কোটা সংস্কার আন্দোলন ও তরুণ সমাজের প্রেরণা

জুলাই ২০২৪ পৃথিবীর ইতিহাসে এক অসাধারণ মাস। এত দীর্ঘ সময়ব্যাপী পরিবর্তনের স্রোত শতাব্দীর মধ্যে আর দেখা যাবে না। তবে এই বিপ্লব কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনার এক বিরল ঘটনা। রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, মানুষে-মানুষে সম্পর্কের উন্নয়ন, সৌহার্দ্য সৃষ্টি এবং জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল এর মূল লক্ষ্য।

এই আন্দোলনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। একে বলা যায় রাজনৈতিক সংঘাতের বিরুদ্ধে এক নতুন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

রাজনৈতিক ব্যর্থতার পটভূমি

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখি – ১৭৫৭, ১৮৬৭, ১৯১১, ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালে বহু পরিবর্তন এসেছিল। কিন্তু নেতারা জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন। এর কারণগুলো ছিল—

রাজনীতির সাথে সাহিত্য-সংস্কৃতির যোগ না ঘটানো।

দেশের নিজস্ব কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব না দেওয়া।

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগে বিদেশী শক্তির প্রভাব বিস্তার।

নিজস্ব ভাবনা ও বয়ান গড়ে তুলতে না পারা।

জুলাই বিপ্লবের আলোকপাত

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব এসব ব্যর্থতার জবাব দিয়েছে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে। কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা সচেতনভাবে কিংবা অচেতনভাবে জনগণকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাই একে নিছক রাজনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক জাগরণ বলা যায়।

তরুণ ও প্রবীণদের ভূমিকা

এই আন্দোলনে তরুণরাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। অনেক প্রবীণ ফ্যাসিবাদী শক্তিকে তুষ্ট করতে বা নিজেদের নিরাপত্তায় ব্যস্ত ছিলেন। তবে কিছু প্রবীণ সাহিত্যিক তরুণদের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

সাহিত্য-সংস্কৃতির অবদান

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান আন্দোলনের বাতিঘর হয়ে ওঠে। তারপরে আল মাহমুদ, ফররুখ আহমদসহ অনেক কবির কবিতা মানুষকে লড়াইয়ের শক্তি দিয়েছে। কবি আবদুল হাই শিকদার তার লেখা ও সংগ্রামের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান, মোহাম্মদ আজমের মতো গবেষক ও কবিরাও লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে বিপ্লবকে তীব্রতর করেন।

অন্যদিকে, কিছু শিল্পী-সাহিত্যিক সুযোগসন্ধানী ভূমিকা নিয়ে ফ্যাসিবাদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছিলেন। আবার আন্দোলনের সময় অনেক তরুণ কবি-সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী রাস্তার আন্দোলনে অংশ নিয়ে জাগরণ সৃষ্টি করেন। গান, নাটক, গ্রাফিতি ও শর্টফিল্ম আন্দোলনকে আরও প্রাণবন্ত করেছে।

জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা

বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন সময়ে নতুন রূপ নিয়েছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল তার চূড়ান্ত রূপ। জুলাই বিপ্লবে এসে তরুণরা ভারতীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ইসলামী জাতীয়তাবাদ কিংবা পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে স্বকীয়, মাটির ঘ্রাণ মেশানো জাতীয়তাবাদের দাবি তুলেছেন।

উপসংহার

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, জুলাই বিপ্লব রাজনৈতিক ঘটনা হলেও এর সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতি। তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এই আকাঙ্ক্ষাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশের দিকনির্দেশনা দেবে এবং একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র গঠনের পথ দেখাবে।

Facebook
WhatsApp
Twitter
LinkedIn
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *