গোলাগুলির মুখোমুখি ১৯শে জুলাই

১৯ শে জুলাই, ২০২৪। শুক্রবার। বাদ জুম্মা। নামাজের পর সবাই কেবল আসতে শুরু করেছে। আমি যখন পৌঁছাই তখন সবে আনুমানিক ২০০ জনের জমায়েত হয়েছে। গোল চক্কর ঘিরে গোল গোল জমায়েত ঘুরছিলো। তবে জনস্রোত বাড়তে থাকে সময়ের সাথে। আমি একাধটু শ্লোগান করে শৃঙ্খলা আনার দায়িত্ব নিই। সবাইকে সতর্ক করি যেন কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তির কেও ক্ষতিসাধন না করে ও মাঠে উপস্থিত জনতার মাঝে দালালদের থেকে সতর্ক থাকে।

জুম্মার আগ থেকে মিরপুর-১২ এর দিকে পুলিশের ভালো ফোর্স মজুদ ছিলো যারা মিরপুর-১০ স্টেশনের দিক থেকে আক্রমণ করে। এরসাথে যুক্ত হয় গুন্ডা ও ছাত্রলীগ। পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও শটগান ব্যাবহার করলেও সন্ত্রাসীদের হাতে ছিলো পিস্তল।

মাঝখানে মিরপুর-১০ স্টেশনকে রেখে দু’পক্ষের সংঘর্ষ চলতে থাকে। মানুষের কাছে সম্বল শুধুই মিরপুর-১০ ট্রাফিক বক্স ভেঙে বের করা কিছু ইটের টুকরো ও বাঁশ-কাঠের লাঠি। অপরদিকে টিয়ারশেল, রাবারবুলেট, শটগান ও বুলেট। জীবনে প্রথম দেখলাম শটগানের ফুলকি, সাউন্ড গ্রেনেডের ফুলকি ইত্যাদি। চোখের সামনে বুলেট ছোঁড়া হচ্ছে, কিন্তু আমি দূরত্ব বজায় রাখায় নিজেকে সুরক্ষিত মনে হচ্ছিলো।

মোটামুটি আড়াইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত আধাঘন্টা সংঘর্ষে তিনটি গুলিবিদ্ধ মানুষকে দেখি। জামা রক্তে চপচপ করছে। এরমাঝে হঠাৎ দুটো আওয়াজ হয়, ককটেল না কি মেট্রোরেল থেকে ছোঁড়া গুলি নিশ্চিত নই। কিন্তু মুহূর্তেই আরো দুজন গুলিবিদ্ধ।

মানুষজনের মনোযোগ এই ঘটনার ঘোরে আবদ্ধ। অপরদিকে মিরপুর-১০ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলমান আক্রমণ।

আমি তখন একটু সরে শাহ্ আলী প্লাজার সামনে। হঠাৎ শুনি কাজীপাড়ার দিক থেকে আক্রমণ শুরু হচ্ছে বলে সেদিকে ব্যাকাপ চাওয়া হচ্ছে। আমি এগিয়ে যেতে গিয়ে দেখি কাজীপাড়া থেকে ৩০-৪০ টি মোটরসাইকেল দ্রুত গতিতে আসছে।

তবুও সাহস করে আক্রমণ প্রতিহত করার মানসিকতা নেই। কিন্তু, হঠাৎ শুরু হয় গুলির আওয়াজ। অর্থাৎ এরা গুলি করার উদ্দেশ্য নিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে তীব্র গতিতে আসছে।

আমি প্রাণভয়ে দৌড় দেই জনতার সাথে। শাহ্ আলী প্লাজার গা ঘেঁষে মিরপুর-১৩ এর দিক দৌড় দেই। একটু আশ্রয় খুঁজছিলাম, কোন মেটাল শিট, বা একটু শেড। একটু দেওয়ালের আড়াল। কিচ্ছু পাচ্ছিলাম না।

দৌড় দিতে দিতে শুনছিলাম এলোপাতাড়ি গুলির আওয়াজ। নিজেকে বলছিলাম, আমাকে বাঁচতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। গুলিবিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুভয় পেলে চলবে না। আতঙ্কে ভুগলে চলবে না। আমাকে বাঁচতে হবে।

প্রাণ নিয়ে শাহ্ আলী প্লাজার পেছনের গলিতে ঢুকি। ততোক্ষণে আক্রমণকারীরাও গোলচক্কর পার হয়ে মিরপুর-১৩ এর দিকে টার্ন নেয়। দোকানের শাটার সব বন্ধ। কোন শেড পাচ্ছি না। শুধু দৌড় দিচ্ছি। দেখলাম ড্রেনের কাজ চলায় ম্যানহোলের বড় গর্ত খুঁড়ে রাখা, ভাবলাম এখানে নামি কি না শেডের জন্য। আর নামি নি অবশ্য।

পেছনে একবার তাকাতে আক্রমণকারীদের মোটরসাইকেল দেখতে পাই এক পলকের জন্য।

অবশেষে টের পাই যে আক্রমণকারীরা চলে গেছে। কিন্তু, নিরাপদ বোধ করছিলাম না। যদি আক্রমণকারীরা এই গলিতে ঢুকে? আতঙ্ক এবার আমাকে ঘিরে ধরলো। এগিয়ে চলছিলাম একা একা। একটা স্যান্ডেল মেইনরোডে শাহ্ আলী প্লাজার সামনেই হারিয়েছি। অপর স্যান্ডেলটিও খুলে ফেলে খালি পায়ে হেঁটে আগালাম নিরাপদ একটি আশ্রয়ের খোঁজে।

আমি সঙ্গীসাথী বিচ্ছিন্ন, একা ও অসহায়।

একটা গ্যারেজ পেলাম। ভেতরে তাকিয়ে দেখি শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের ছবি। তবুও মনে হলো এরা ভালো লোক। দাঁড়ালাম গ্যারেজের সামনে।

দাঁড়াতেই একটা রিক্সা এলো, দুজন মানুষের কোলে একটা বডি। তেমন একটা রক্ত নেই, কিরকম ইনজুরি ঐ মূহুর্তে বুঝতে পারি নি।

একটু পর চারজন সাথী একই পথে এলো। দেখে অবশেষে নিরাপত্তার একটা অনুভূতি পেলাম। একজন সঙ্গী বললেন যে, রিক্সায় নেওয়া সেই বডিটি তার পেছনেই বুলেট হিট খেয়েছে, হেডশট। রেসকিউয়ার তার বডি উল্টালে মগজের কিছু অংশ বের হয়ে আসে রেসকিউয়ারের পায়ের উপর। তারকাছে ভিডিও করা ছিলো রেসকিউয়ের সময়কার।

তিনজন সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা ফিরে যাবো। আশঙ্কা আর পুনরায় হামলার ভয় নিয়ে ফিরে আসতে লাগলাম। আমাকে ফিরতে হবে সেই পথ ধরে যেদিক দিয়ে আক্রমণ হয়েছে। পথে কি আরো শত্রু রয়েছে ঘাপটি মেরে?

এদিকে আমার পায়ে নেই স্যান্ডেল। শত্রুরা দেখলেই চিনে ফেলবে।

আতঙ্ক নিয়ে অবশেষে নিরাপদ আশ্রয়ের দিক আগালাম খালি পায়ে হেঁটে, তারপর একটা রিক্সা পেলাম। তিনজন এলাম নিরাপদ গন্তব্যে।

মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে আসলাম সেদিন। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জেনেছি সেই আক্রমণে মূহুর্তেই তিনজনের মৃত্যু হয়।

আমরা ফিরে এলেও জনতা আবার ফিরে আসে এবং ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয় কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ এলাকায়।

একটি সূত্র থেকে জানতে পারি যে, শুক্রবার একটি হাসপাতালে ৭টি মৃতদেহ ছিলো। সেই হাসপাতালটিতে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী ঢুকে জিএম-কে শাসিয়েছিলো যেন আহতদের চিকিৎসা না দেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালটি তবুও বিনামূল্যে চিকিৎসা অব্যাহত রাখে।

আশেপাশের হাসপাতালে আরো মৃতদেহ ছিলো।

Facebook
WhatsApp
Twitter
LinkedIn
Pinterest

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *